| |
               

মূল পাতা বিশেষ প্রতিবেদন বিশ্বের প্রথম রাজধানী হিসেবে পানিশূন্য হওয়ার পথে আফগানিস্তানের কাবুল


বিশ্বের প্রথম রাজধানী হিসেবে পানিশূন্য হওয়ার পথে আফগানিস্তানের কাবুল


শেখ আশরাফুল ইসলাম     06 July, 2025     04:02 PM    


গত এক দশকে ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে অন্তত ৩০ মিটার। এমতাবস্থায় বিশ্বের প্রথম রাজধানী হিসেবে পানিশূণ্য হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কাবুলের।

বিশেষজ্ঞরা এমন অবস্থার জন্য দায়ি করছেন দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অব্যবস্থাপনাকে। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে, যদি এই ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে কাবুলের ভূগর্ভস্থ পানি একেবারে উধাও হয়ে যেতে পারে। যেটা সেখানকার বাসিন্দাদের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

“মার্সি কর্পস” নামে আন্তর্জাতিক এক এনজিওর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের প্রায় অর্ধেক নলকূপ ইতোমধ্যেই শুকিয়ে গেছে। প্রতি বছর কাবুল থেকে ৪৪ মিলিয়ন ঘনমিটার বেশি পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, যা প্রকৃতি থেকে পুনরায় ভরাট হওয়ার সক্ষমতার প্রায় দুই গুণ।

গত বিশ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে তিন গুণ :

২০০০ সালে কাবুলের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২০ লাখ। বর্তমানে তা ৬০ লাখ ছাড়িয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে শহরটির উপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় এর চাপ উল্লেখযোগ্য। শহরে প্রায় ১ লাখের বেশি অবৈধ নলকূপ রয়েছে, যেখানে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

কারখানা ও গ্রিনহাউসে ব্যবহৃত পানি :

শুধু কাবুলেই রয়েছে প্রায় ৪০০ হেক্টর গ্রিনহাউস। যেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় বছরে ৪ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি। এছাড়া শহরটিতে রয়েছে পাঁচ শতাধিক পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, যাদের মধ্যে অন্যতম আলোকোজয় কোম্পানি। যেটি একাই বছরে ১০ লাখ ঘনমিটার পানি ব্যবহার করে।

পানি কিনে খেতে হয়; অনেকের নেই সামর্থ্য : 

ইতোমধ্যে শহরের ধনী এলাকাগুলোতেও পানি সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। উত্তর-পশ্চিম কাবুলের তায়মানি এলাকার এক বাসিন্দা পানি সঙ্কটের ভয়াবহতা তুলে ধরে গণমাধ্যমকে বলেছেন, “আমার মাসিক বেতন ২১,০০০ আফগানি (৩০০ ডলার)। এর মধ্যে কমপক্ষে ৫,০০০ আফগানি (৭০ ডলার) শুধু পানির পেছনে খরচ হয়। আমার পরিবারে ১০ জন সদস্য। এটা খুব কষ্টকর আমার জন্য।”

তিনি বলেন, পানির অনেক দাম। যাদের কাছে পানি কেনার টাকা নেই, কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে পাবলিক ওয়াটার পাম্প থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয় তাদেরকে। এমনকি প্রচণ্ড গ্রীষ্মের আবহাওয়ায়ও কাবুলের অনেক অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক সপ্তাহে মাত্র একবার বা দুবার পানি পায়।

বিষাক্ত পানি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি : 

জাতিসংঘের মতে, আফগানিস্তানের ৮০ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাবুলের অনেক ভূগর্ভস্থ পানি মলমূত্র, বিষাক্ত রাসায়নিক এবং আর্সেনিক দ্বারা দূষিত। এগুলোতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে।

মার্কিন সমর্থিত ক্ষমতাচ্যূত আফগান সরকারের গাফলতি :

বিশ্বব্যাংকের মতে, মার্কিন সমর্থিত ক্ষমতাচ্যূত আফগান সরকার আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ সহযোগীতা পেয়েছিল। তবুও পানি ব্যবস্থাপনায় কোনো উন্নতি হয়নি। সংকট আরও তীব্রতর হয়েছে।

সম্ভাব্য সমাধান : 

পানি ব্যবস্থাপনার ভয়াবহ এই সংকট রুখতে হলে কাবুল থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে শাহতুত বাঁধ এবং জলাধার নির্মাণ করতে হবে ইমারাতে ইসলামিয়া আফগান সরকারকে। এটি সম্পন্ন হলে শহরের ২০ লক্ষেরও বেশি বাসিন্দাকে পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। জলাধারগুলোও পরিপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আরেকটি প্রকল্পে ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। যেটা প্রতি বছর পাঞ্জশির নদী থেকে রাজধানীতে ১০০ মিলিয়ন ঘনমিটারেরও বেশি পানি সরিয়ে নেবে।

গত এপ্রিল মাসে ইমারাতে ইসলামিয়ার জ্বালানি ও পানি মন্ত্রণালয় বলেছিল, তারা পাঞ্জশের নদীর পাইপলাইন নির্মাণের কাজ শুরু করার জন্য বাজেট অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন হয়ে গেলেই কাজ শুরু হবে। সরকার ১৭০ মিলিয়ন ডলারের এই উদ্যোগের জন্য অতিরিক্ত বিনিয়োগকারী খুঁজছে বলেও মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়।

আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রয়োজন :

কাবুলের পানি সম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ আব্দুল বাসেত রহমানি বলেন, আফগানিস্তানের রাজধানীতে পানির ঘাটতি দেড় বছরের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব। তবে এর জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলিকে এগিয়ে আসতে হবে। কাবুলের দরিদ্র মানুষদের জরুরি সহায়তা প্রদান করতে হবে, যারা পানি কিনতে অক্ষম।

তিনি আরও বলেন, এই ধরনের সহায়তা এই মানুষদের বিশাল আর্থিক ও মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেবে। একই সাথে রোগ প্রতিরোধ এবং অনেক শিশুকে স্কুলে ফিরে আসতে সাহায্য করবে। অনেক শিশু আছে যারা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে না, কারণ তাদের পরিবারকে সাহায্য করার জন্য তারা প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার হেঁটে এমন জায়গায় যায় যেখানে বিনামূল্যে পানি বিতরণ করা হয়।

সূত্র : টোলো নিউজ, আফগানিস্তান সান।